নারীর ক্ষমতায়ন ও বাংলাদেশ
উত্তর: পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। নারীরা এখন আর শুধু অন্তঃপুরবাসী নয়, বরং তারা উন্নয়নে পুরুষের সম অংশীদারিত্বের দাবি রাখে। অথচ বাংলাদেশের নারীসমাজ যুগ যুগ ধরে শোষিত ও অবহেলিত হয়ে আসছে। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বেড়াজালে নারীদের সর্বদা রাখা হয়েছে অবদমিত। তাদের মেধা ও শ্রমশক্তিকে সমাজ ও দেশ গঠনে সম্পৃক্ত করা হয়নি । নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে গ্রহণ করা হয়নি কোনো বাস্তব পদক্ষেপ। অথচ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করতেও পুরুষের পাশাপাশি সহায়তা করে নারী এটি কোনো একমুখী প্রক্রিয়া নয় বরং দ্বিপাক্ষিক প্ৰক্ৰিয়া ।
নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন: নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যক্তির অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সর্বজনীনতা সংরক্ষণ করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে নারীর স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করা। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন ।
বাংলাদেশের সংবিধানে নারী : ব্রিটিশ ভারতীয় উপমহাদেশে নারী জাগরণের বিষয়টি যেমন বাস্তবসম্মত ছিল তদ্রুপ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নারী অধিকারের বিষয়টি সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়ায় । তাই এ দেশের জাতীয় উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ আবশ্যক হয়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালে নবগঠিত রাষ্ট্র বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিধান সন্নিবেশিত হয়। সংবিধানের ২৮(১) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।' ২৮(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন।' ২৮(৩)-এ উল্লেখ আছে, 'কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা বিশ্রামের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনোরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাবে না। ২৮(৪)-এ উল্লেখ আছে, 'নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হতে এই অনুচ্ছেদের কোনো . কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না।' ২৯(১)-এ রয়েছে, 'প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে। ৬৫(৩) ধারায় নারীর জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে এবং এ ধারার অধীনে স্থানীয় শাসনসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
উন্নয়ন পরিকল্পনা : ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়। শুধু সংবিধানে নয়, বাস্তব জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো নারীসমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ সমাজের সকল স্তরে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। স্বাধীনতা সংগ্রামে যে সকল নারী অবদান রেখেছেন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, সেসব নারীর পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরকার। সে সময় ১৯টি জেলা ও ২৭টি মহকুমাসহ মোট ৬৪টি কেন্দ্রের মাধ্যমে নারী উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু হয়।
নারী পুনর্বাসন বোর্ডের দায়িত্ব ও কর্মপরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৭৪ সালে এ বোর্ড বৃহত্তর কলেবরে পুনর্গঠিত করে সংসদের একটি অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত করা হয়। ফাউন্ডেশনের বহুবিধ কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম ছিল :
১. দেশের সকল জেলা ও মহকুমায় নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা;
২. নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান;
৩. নারীকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করে প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা;
৪. উৎপাদন ও প্রশিক্ষণ কাজে নিয়োজিত নারীর জন্য দিবাযত্ন সুবিধা প্রদান করা;
৫. যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের চিকিৎসা প্রদান করা এবং
৬. মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বৃত্তিপ্রথা চালু করা।
অনুরূপভাবে দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনায়ও (১৯৭৮-৮০) নারীর কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও (১৯৮৫-৯০) একই কর্মসূচি গৃহীত হয়। চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৯০-৯৫) নারী উন্নয়নকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে আন্তঃখাত উদ্যোগ গৃহীত হয় ।
সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরণ : নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ডকে' নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত করার পর নারী উন্নয়নে নীতি নির্ধারণের লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে মহিলাবিষয়ক স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন করে। এছাড়া ১৯৭৬ সালে সরকারি রেজুলেশনবলে জাতীয় মহিলা সংস্থা গঠিত হয় এবং ১৯৯১ সালে জাতীয় মহিলা সংস্থাকে বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়। সরকারের গৃহীত নারী উন্নয়ন কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে মহিলাবিষয়ক পরিদপ্তর গঠিত হয় এবং ১৯৯০ সালে এ পরিদপ্তরকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়। এছাড়া ১৯৭৬ সালে শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৪ সালে শিশু বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নামকরণ করা হয় 'মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়'।
১৯৯০ সালের পর থেকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৯৯৪ সালের ৫ মার্চ থেকে শিশুবিষয়ক, ১৯৯৫ সালে বেইজিং কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং ১৯৯৬ সালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত হয়। এছাড়াও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় যেসব অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে তা হলো : ক. নারীসমাজকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণ, খ. নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ সনদ (সিডো) বাস্তবায়ন এবং নিয়মিতভাবে জাতিসংঘে প্রতিবেদন প্রেরণ, গ. মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থার বিষয়াদি, ঘ. শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) বাস্তবায়ন ও জাতিসংঘে প্রতিবেদন প্রেরণ, ঙ. জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, চ. বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে আন্তঃমন্ত্রণালয় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়েছে। নারী ও মেয়ে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থায় নারী ও শিশু নির্যাতন সেল এবং জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে ।
iii. আইনি পদক্ষেপ: বাংলাদেশে নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি নির্যাতন রোধকল্পে কতিপয় প্রচলিত আইনের সংশোধন ও নতুন আইন প্রণীত হয়েছে। এসব আইনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুসলিম পারিবারিক আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, বাল্যবিবাহ রোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ (বিশেষ বিধান) আইন প্রভৃতি । নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইনগত সহায়তা ও পরামর্শ প্রদানের জন্য নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, নির্যাতিত নারীদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া আইনজীবীর ফি ও অন্যান্য খরচ বহনে সহায়তা দানের উদ্দেশ্যে জেলা ও সেশন জজের অধীনে নির্যাতিত নারীদের জন্য একটি তহবিল রয়েছে।
iv. প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সরকার নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অন্তর্ভুক্তি তথা উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভাতেও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ৪ জন নারী সাংসদ ছিলেন (যা ৬ আগস্ট ২০২৪ রাষ্ট্রপতির এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়)। যেখানে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সরকার দলীয় উপনেতা তিন জনই ছিলেন নারী। ৭ জানুয়ারি ২০২৪ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারি ও বিরোধী দলসহ ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৭০টি আসনে নারীরা জয়লাভ করে, যেখানে ২০
জন নির্বাচিত আর ৫০ জন সংরক্ষিত আসনে মনোনীত। ইউনিয়ন পরিষদের ১২টি সদস্যপদের মধ্যে ৯টিতে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখাসহ সংরক্ষিত ৩টি আসনে নারীর প্রতিযোগিতার সুযোগ রাখা হয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী সরকারের আমলে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তার মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের মহিলাদের সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটে নির্বাচন। ইউপি নির্বাচনে বহু নারী সরাসরি ভোটে চেয়ারম্যান ও মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন। গ্রাম পরিষদেও ৩০% নারীর অংশগ্রহণ সংরক্ষণ করা হয়েছে । একইভাবে উপজেলা ও জেলা পরিষদে ৩০% মহিলা নির্বাচিত হয়। ফলে সারা বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে নারীদের অংশগ্রহণ শক্তিশালী হয়েছে বলে আশা করা যায়। তাছাড়া পার্লামেন্টেও নারীর অংশগ্রহণ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ও সরকারের কর্মপরিকল্পনা : ইতোপূর্বে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারী উন্নয়নে কর্মসূচি ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হলেও তা ছিল বিচ্ছিন্ন ও সমন্বয়হীন। কিন্তু বেইজিং নারী উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনায় নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে যে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত হয়েছে তার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়ন কৌশল প্রণয়নের লক্ষ্যে ও বেইজিং ঘোষণা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের ফলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে যার প্রধান লক্ষ্য হলো নির্যাতিত ও অবহেলিত এ দেশের বৃহত্তম নারী সমাজের ভাগ্যোন্নয়ন করা। নারী উন্নয়ন নীতির প্রধান লক্ষ্যসমূহ হলো নিম্নরূপ :
রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা;
নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা;
নারীকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা; নারী সমাজকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা;
নারী-পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন করা;
সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে নারীর অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা;
জাতীয় জীবনে সর্বত্র নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা,
নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধ করা; রাজনীতি, প্রশাসন ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্র, আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ড,
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং পারিবারিক জীবনের সর্বত্র নারীপুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা;
বিধবা, অভিভাবকহীন, স্বামী পরিত্যক্তা, অবিবাহিতা ও সন্তানহীনা নারীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা;
গণমাধ্যমে নারী ও মেয়ে শিশুর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরাসহ জেন্ডার প্রেক্ষিত প্রতিফলিত করা;
মেধাবী ও প্রতিভাময়ী নারীর সৃজনশীল ক্ষমতা বিকাশে সহায়তা দেওয়া; '
নারী উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহায়ক সেবা প্রদান করা ইত্যাদি।
উপরিউক্ত লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নে সরকার যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তা নিম্নে প্রদত্ত হলো :
নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা বাস্তবায়ন
- মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা; যেমন- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের যে সমঅধিকার, তার স্বীকৃতিস্বরূপ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করা;
নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডো) বাস্তবায়ন করা; সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায়ে নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেওয়া;
শিক্ষা পাঠ্যক্রম, বিভিন্ন পুস্তকাদিতে নারীর অবমূল্যায়ন দূরীভূত করা এবং নারীর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা;
নারী-পুরুষ শ্রমিকদের সমান মজুরি ও কর্মস্থলে নিরাপত্তা প্রদান এবং চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা;
নারীর অংশগ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অ-প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীর অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া;
সরকারের জাতীয় হিসাবসমূহে গার্হস্থ্য শ্রমসহ সকল নারী শ্রমের সঠিক প্রতিফলন নিশ্চিত করা;
নারী যেখানে অধিক সংখ্যক কর্মরত আছেন সেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা, বাসস্থান, বিশ্রামাগার, পৃথক প্রক্ষালন কক্ষ এবং দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা ।
ii. নারীর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন দূরীকরণ
পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়ন, নারী ধর্ষণ, পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগ, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করা;
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্পর্কিত প্রচলিত আইন যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সংশোধন এবং নতুন আইন প্রণয়ন করা;
নির্যাতিত নারীকে আইনগত সহায়তা দেয়া;
নারী পাচার বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা;
নারীর প্রতি নির্যাতন দূরীকরণ এবং এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগের জন্য বিচার ব্যবস্থায় পুলিশ বাহিনীর সর্বস্তরে বর্ধিত হারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ।
iii. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
- নারীশিক্ষা বৃদ্ধি, নারী-পুরুষের মধ্যে শিক্ষার হার ও সুযোগের বৈষম্য দূর করা এবং উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে সক্রিয় ও স্পষ্ট নীতি অনুসরণ করা;
আগামী দশ বছরে নিরক্ষরতা দূর করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা, বিশেষত মেয়ে শিশু ও নারীসমাজের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া;
টেকসই উন্নয়ন ও অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে নারীর জন্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ ও শক্তিশালী করা;
শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী ও মেয়েশিশুর সমান অধিকার নিশ্চিত করা, শিক্ষার সকল পর্যায়ে অসমতা দূর করা, শিক্ষাকে সর্বজনীন করা, ভর্তির হার বৃদ্ধিসহ নিরক্ষরতা দূর করা এবং মেয়েশিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা;
নারীর দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল প্রশিক্ষণে নারীকে সমান সুযোগ দেওয়া;
কারিগরি প্রযুক্তিগত ও উচ্চশিক্ষাসহ শিক্ষার সকল পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা
iv. জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর সক্রিয় ও সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ
অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাজমান পার্থক্য দূর করা; অর্থনৈতিক নীতি (বাণিজ্যনীতি, মুদ্রানীতি, করনীতি প্রভৃতি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা; নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি লক্ষ্য রেখে সামষ্টিক অর্থনীতিতে নীতি প্রণয়নে ও কর্মসূচিতে নারীর চাহিদা ও স্বার্থ বিবেচনায় রাখা; সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির প্রয়োগে বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রতিহত করার লক্ষ্যে নারীর অনুকূলে Safety nets গড়ে তোলা । জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নারীর দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা দান ও অনুপ্রাণিত করা।
vi. নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জরুরি বিষয়াদি যথা— স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জীবনব্যাপী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, তথ্য, উপার্জনের সুযোগ, উত্তরাধিকার, সম্পদ, ঋণ প্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদসহ ভূমির ওপর অধিকার ইত্যাদির ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ ও সমান সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া এবং এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা ৷
vii. নারীর কর্মসংস্থান
নারীর শ্রমশক্তির শিক্ষিত ও নিরক্ষর উভয় অংশের কর্মসংস্থানের জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা;
চাকরির ক্ষেত্রে নারীর বর্ধিত নিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রবেশ পর্যায়সহ সকল ক্ষেত্রে কোটা বৃদ্ধি এবং কার্যকর করা;
সকল কর্মসংস্থানের নীতির আওতায় চাকরির ক্ষেত্রে নারীকে সকল প্রকার সমসুযোগ প্রদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করা;
নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সরকার অনুসৃত কোটা ও নারী উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণদান কর্মসূচি গ্রহণ করা;
নারীর বর্ধিত হারে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, অবস্থান ও অগ্রসরমানতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে তোলা;
নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল আইন, বিধি ও নীতির প্রয়োজনীয় সংস্কার করা।
vii. নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
রাজনীতিতে অধিক হারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রচার মাধ্যমসহ রাজনৈতিক দলসমূহকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণে উদ্ধুদ্ধ করা;
নারীর রাজনৈতিক অধিকার অর্জন ও প্রয়োগ এবং এর সুফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা;
নির্বাচনে অধিক হারে নারীপ্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুপ্রাণিত করা;
নারীর রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের ও প্রতিষ্ঠার ভোটাধিকার প্রয়োগে সচেতন করা এবং তৃণমূল পর্যায় জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ভোটার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা; সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ স্তর মন্ত্রিপরিষদে, প্রয়োজনে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারার অধীনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী নিয়োগ করা।
viii. নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন
প্রশাসনিক কাঠামোর উচ্চ পর্যায়ে নারীর জন্য সরকারি চাকরিতে প্রবেশ সহজ করার লক্ষ্যে চুক্তিভিত্তিক এবং সরাসরি প্রবেশের (লেটারেল এনট্রি) ব্যবস্থা করা;
বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশন, পরিকল্পনা কমিশন, বিচার বিভাগের উচ্চ পদে নারীদের নিয়োগ প্রদান করা;
জাতিসংঘের বিভিন্ন শাখা ও অঙ্গ সংগঠনে এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি বা প্রার্থী হিসেবে নারীকে নিয়োগ/মনোনয়ন দেয়া;
নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে প্রবেশ পর্যায়সহ সকল পর্যায়ে, গেজেটেড ও নন-গেজেটেড পদে কোটা বৃদ্ধি করা ৷
ix. বিশেষ দুর্দশাগ্রস্ত নারী
নারীর অবস্থানের বিভিন্নতা এবং বিশেষভাবে দুর্দশাগ্রস্ত নারীর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তাদেরকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য পদক্ষেপ ও কর্মসূচি গ্রহণ করা ।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, নারীর ক্ষমতায়নের ধারণা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সে কারণে বাংলাদেশ বেইজিং-এ নারী উন্নয়ন ও কর্মপরিকল্পনায় যে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত হয়েছে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। সুশীল সমাজ গঠনে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে মানবিক মূল্যবোধের অনুশীলন করার লক্ষ্যে শুধু সরকারি প্রচেষ্টা নয়, বেসরকারি সংস্থাসমূহের দায়দায়িত্বও অনেক। সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টায় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হতে পারে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় ৷


0 Comments